
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগকে মিথ্যা ও অপপ্রচার দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেছে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জ-কাছিরগাঁও-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের সংস্কারকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে দলটি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল ১১টায় সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্টেশন এলাকার পানসী রেস্টুরেন্টের হলরুমে জেলা বিএনপির উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। এ সময় সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল হকসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বলেন, সুনামগঞ্জ-কাছিরগাঁও-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকাদার মো. বদরুল ইসলাম গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদার দেশ ছেড়ে চলে গেলে প্রকল্পের প্রথম সাব-ঠিকাদার হিসেবে তাহিরপুরের বালিজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী আজাদ হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মতবিরোধের কারণে দ্বিতীয় সাব-ঠিকাদার হিসেবে শফিকুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন আরও বলেন, গত ২৭ অক্টোবর সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বিশ্বম্ভরপুরের রতারগাঁও হাইস্কুলে একটি অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে স্থানীয় বাসিন্দারা সড়ক নির্মাণকাজের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ জানান। পরে সংসদ সদস্য নিজেও নির্মাণকাজ পরিদর্শন করে একটি সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল একদিকে হেলে পড়তে দেখেন বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
তার অভিযোগ, ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাকশন না করা, জিও টেক্সটাইলের ওপর নিম্নমানের ব্লক স্থাপন এবং ভিট বালুর পরিবর্তে কৃষিজমির ওপরের মাটি ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য পরদিন ঠিকাদার ও সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে নির্মাণকাজের স্থান পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই সংশ্লিষ্ট সাব-ঠিকাদার সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে এ অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তোলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। তাঁর দাবি, প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় ৮৭ কোটি টাকা দেখানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ছাড়া নির্মাণকাজে ৭ লাখ ঘনফুট মাটির প্রয়োজনের বিপরীতে ৫৬ লাখ ঘনফুট মাটি ধরা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রকল্পের কাজের নিম্নমান এবং বিল উত্তোলন নিয়ে অনিয়ম হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সড়ক বিভাগের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়।
দাবিগুলো হলো—
১. প্রকল্পের শুরু থেকে দুর্নীতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে অতিরিক্ত মূল্য দেখানোর মাধ্যমে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে ফেরত আনতে হবে।
৩. ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া নিম্নমানের কাজ বাতিল করে প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে পুনরায় কাজ করতে হবে।
৪. সংস্কারকাজে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চলমান অন্যান্য প্রকল্পের কাজও তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপি নেতারা বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের নির্মাণকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।