

কালীগঞ্জ(লালমনিরহাট)প্রতিনিধিঃ
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার মদাতী ইউনিয়নে চুরির মাইক কেনার অপবাদে মফিজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে বেধড়ক পিটিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) শাহজাদা সেলিম।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই বর্বরোচিত ঘটনার ভিডিও চিত্র নজরে আসার পর স্ব-প্রণোদিত হয়ে (সুও মটো) মামলা রুজু করেছেন আদালত। একই সাথে ঘটনাটি তদন্ত করে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে এবং অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের জন্য কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত শুক্রবার (৫ জুন) সকালে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ আমলী আদালত-৫ এর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাজীব মিয়া ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) ১৮৯৮-এর ১৯০(১)(সি) ধারা অনুযায়ী অপরাধ আমলে নিয়ে স্ব-প্রণোদিত হয়ে এই আদেশ প্রদান করেন। আদালত আগামী ১৪ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৪ জুন বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ও কয়েকটি গণমাধ্যমের ডিজিটাল প্লাটফর্মে একটি ভিডিও প্রতিবেদন বিজ্ঞ আদালতের নজরে আসে। যার শিরোনাম ছিল “মফিজুলকে স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে পেটালেন সেলিম মেম্বার” এবং “লালমনিরহাটের মদাতীতে চুরির মাইক ক্রয় করায় মফিজুলকে পেটালেন শাহজাদা সেলিম মেম্বার”। উক্ত ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, প্রকাশ্য দিবালোকে বহু মানুষের উপস্থিতিতে একজন মাঝবয়সী লাল শার্ট পরিহিত ব্যক্তিকে (ভিকটিম মফিজুল) গ্রাম পুলিশের হাত থেকে লাঠি নিয়ে সাদা শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত এক ব্যক্তি (ইউপি সদস্য শাহজাদা সেলিম) নিষ্ঠুরভাবে মারধর করছেন।
বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর আদেশে পর্যবেক্ষণ দিয়ে উল্লেখ করেন, আধুনিক যুগে বসবাস করেও প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রী-সন্তান ও শত শত মানুষের সামনে এমন লাঠিপেটা মধ্যযুগীয় বর্বরোচিত ঘটনাকেও হার মানায়, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এখতিয়ার নেই। তাছাড়া জোরপূর্বক লাঠিপেটা করে কোন কিছু আদায় করার চেষ্টা করা হচ্ছে বা বাধ্য করা হচ্ছে যা দণ্ডবিধি (Penal Code) ১৮৬০ এর ৩২৩/৩২৫/৩৮৫/১১৪ ধারা এবং আইনশৃংখলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ এর ৪ ধারা অনুযায়ী গুরুতর ও আমলযোগ্য অপরাধ।
আদালত আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ঘটনাস্থলে গ্রাম পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এই বর্বরোচিত মারধর থামানো হয়নি। এতে আপাতদৃষ্টিতে সন্দেহের সৃষ্টি হয় যে, মদাতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী মহল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই অপরাধের সাথে জড়িত বা নেপথ্যের ইন্ধনদাতা হিসেবে কাজ করে থাকতে পারেন।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, ভিকটিম ও সাক্ষীদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ এবং নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের শনাক্ত করতে কালীগঞ্জ থানার ওসি-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন মূল অপরাধী বা ইন্ধনদাতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করার আদেশ দেওয়া হয়। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উক্ত ভিডিও চিত্রটি আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করে তদন্ত প্রতিবেদনের সাথে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে। যেহেতু অভিযুক্ত ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন গ্রহণের জন্য এই আদেশের একটি অনুলিপি লালমনিরহাটের উপপরিচালক (local government) বরাবর প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সিদ্দিক বলেন, আদালতের নির্দেশ পেয়েছি এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনী সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা লালমনিরহাট জেলার সভাপতি নূর আলমগীর অনু বলেন, বিষয়টি অমানবিক, এটি ফৌজদারি অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। উক্ত ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
আপনার মতামত লিখুন :