

সিলেট প্রতিনিধি
সিলেট বিভাগে মাদকের বিস্তার দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশের পাশাপাশি তা নগর থেকে প্রত্যন্ত জনপদে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়মিত ইয়াবা, বিদেশি মদ, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এরই মধ্যে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গত তিন দিনে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে প্রায় ৬২ লাখ টাকার মাদক জব্দ করা হয়েছে। এসব অভিযানে আটজনকে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়েছে।
পুলিশ ও র্যাবের তথ্যমতে, গত তিন দিনে সবচেয়ে বেশি মাদক উদ্ধার হয়েছে সিলেট জেলায়। সিলেট জেলা পুলিশ ও ডিবির পৃথক অভিযানে ১২ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা এবং দক্ষিণ সুরমায় ১৮১ লিটার বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া সিলেট মহানগর পুলিশের এয়ারপোর্ট থানা ৪৮ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করে।
সুনামগঞ্জের দিরাই থানা পুলিশ ১ হাজার ৩০৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। অন্যদিকে হবিগঞ্জের মাধবপুরে র্যাব-৯ এর অভিযানে ৩৬১ বোতল এসকাফ সিরাপ, ৬ কেজি গাঁজা ও এক বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই পুলিশ ক্যাম্পের সামনে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে একটি নোহা গাড়ি থেকে ৭ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় উসমান উদ্দিন ওরফে মারুফ (২৯), পারভেজ আহমেদ (২৫) ও আশরাফুল হককে আটক করা হয়। উদ্ধার ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
একই দিন জকিগঞ্জ থানার পুলিশ ভরণ সুলতানপুর এলাকায় চেকপোস্ট পরিচালনা করে ৪ হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ মো. সায়েদ আহমদ (২৯) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। এসব ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ১২ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
এর আগে সোমবার (২৪ আগস্ট) রাতে জকিগঞ্জের দক্ষিণ বিপক এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭০০ পিস ইয়াবাসহ সবুর মিয়া (৩৩) ও রুবেল মিয়া (২৮) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে সিলেট জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। উদ্ধার ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ২ লাখ ১০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে দক্ষিণ সুরমার নাজিরবাজার এলাকায় একটি প্রাইভেটকারে অভিযান চালিয়ে ১৮১ বোতল বা ১৮১ লিটার বিদেশি মদ উদ্ধার করে দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ। উদ্ধার মদের আনুমানিক বাজারমূল্য ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এ সময় মদ পরিবহনে ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি জব্দ করা হয়।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের শ্যামারচর এলাকার খালপাড় হাটি ব্রিজে অভিযান চালায় পুলিশ।
এ সময় ১ হাজার ৩০৫ পিস ইয়াবাসহ শিশ আহমদ (৩৫) নামে একজনকে আটক করা হয়। উদ্ধার ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ৬ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা।
এ ঘটনায় শিশ আহমদ ও দিরাই উপজেলার হাসিমপুর গ্রামের রন দাশ (৪২) নামে আরও একজনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে। আটক শিশ আহমদকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
হবিগঞ্জের মাধবপুরে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দিনগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে অভিযান চালিয়ে ৩৬১ বোতল এসকাফ সিরাপ, ৬ কেজি গাঁজা ও এক বোতল বিদেশি মদসহ ফাতেমা বেগম (২৫) নামে এক নারীকে আটক করে র্যাব-৯।
উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের রসুলপুর এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। র্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে দুজন পালানোর চেষ্টা করলে একজনকে আটক করা সম্ভব হয়।
পরে আটক ফাতেমা বেগমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বসতঘরের খাটের নিচে থাকা দুটি পাটের বস্তা তল্লাশি করে এসব মাদক উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার এসকাফ সিরাপের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ৬ কেজি গাঁজার বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা।
সিলেট মহানগর পুলিশের এয়ারপোর্ট থানা বুধবার (২৬ আগস্ট) রাতে ধোপাগুল পয়েন্ট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৮ বোতল বিদেশি মদসহ একটি সিএনজি অটোরিকশা জব্দ করে। এ ঘটনায় জুনেদ (১৯) নামে এক যুবককে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে গত তিন দিনে উদ্ধার হওয়া মাদকগুলোর মধ্যে যেসব মাদকের বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার মোট মূল্য ৬১ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬২ লাখ টাকা। তবে এয়ারপোর্ট থানা থেকে উদ্ধার করা ৪৮ বোতল এবং হবিগঞ্জে উদ্ধার করা এক বোতল বিদেশি মদের বাজারমূল্য এ হিসাবে যুক্ত করা হয়নি।
সিলেট জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার ও মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা সম্রাট তালুকদার বলেন, “জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো মাদক পাচারের রুট। এসব এলাকায় পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যার কারণে সম্প্রতি জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে ইয়াবার বড় চালান উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূলহোতাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকের ব্যাপারে জেলা পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।”
সিলেট মহানগর পুলিশের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মনজুররুল আলম বলেন, “এসএমপিতে মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। মাদক ও অনলাইন জুয়াসহ সব ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড নির্মূলে এসএমপির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
র্যাব-৯-এর গণমাধ্যম কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে. এম. শহীদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, “র্যাব প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মাদক উদ্ধার, হত্যা মামলা, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, জঙ্গি দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। সিলেটে মাদকের বিস্তার রোধে র্যাবের অভিযান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।”
আপনার মতামত লিখুন :