শিক্ষকতা ছিল নেশা, মানুষ গড়াই স্বপ্ন—গোল্টু স্যার আজও অম্লান


dailymukti24 প্রকাশের সময় : ২০২৬-০৮-০৮, ১১:৫০ AM /
শিক্ষকতা ছিল নেশা, মানুষ গড়াই স্বপ্ন—গোল্টু স্যার আজও অম্লান

রবিউল ইসলাম |রাজশাহী
মুখভরা মায়াবী হাসি, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর—তবু চোখেমুখে আজও সেই চেনা প্রাণশক্তি। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে এমনই এক ভালোবাসার নাম প্রভাত কুমার নন্দী, যিনি সবার কাছে পরিচিত ‘গোল্টু স্যার’ নামে।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড, হাতে চক আর শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত সময়ই ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও শিক্ষার্থীদের হৃদয় থেকে যেন কখনোই অবসর নেননি তিনি।
আড়ানী মনমোহিনী উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করেছেন গোল্টু স্যার। কঠিন ইংরেজি ব্যাকরণ কিংবা জটিল বিষয়গুলোও সহজ উদাহরণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। তাঁর ক্লাস ছিল নিয়ম-শৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ, তবে কখনোই শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের ছিল না।
শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাকেই তিনি দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব। সততা, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, অধ্যবসায় ও মানবিকতার মতো মূল্যবোধকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতেন তিনি।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে তাঁর কঠোর শাসনের পাশাপাশি গভীর স্নেহের কথাও। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এলে তিনি খোঁজ নিতেন। পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে আলাদা করে ডেকে বুঝিয়ে বলতেন। আবার কেউ ভালো ফল করলে নিজের সন্তানের সাফল্যের মতোই আনন্দ প্রকাশ করতেন।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তাঁর হাতে গড়ে উঠেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, ব্যাংকার, আইনজীবী, সাংবাদিক কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই জীবনের পথচলায় গোল্টু স্যারের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
গোল্টু স্যারের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পদক, সনদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
আজও আড়ানী বাজার কিংবা এলাকার কোনো স্থানে তাঁর সঙ্গে দেখা হলে সাবেক শিক্ষার্থীরা ছুটে এসে সালাম দেন, কুশল বিনিময় করেন। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও তাঁদের ভালোবাসায় যেন নতুন প্রাণ ফিরে পান তিনি। মুখে ফুটে ওঠে সেই চিরচেনা হাসি।
বর্তমান সময়ে শিক্ষার সাফল্য অনেকাংশেই যখন পরীক্ষার ফলাফল ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনের মানদণ্ডে বিবেচিত হয়, তখন প্রভাত কুমার নন্দীর মতো শিক্ষকদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু ভালো ফলাফল নয়; একজন শিক্ষার্থীকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও শিক্ষার অন্যতম বড় দায়িত্ব।
প্রভাত কুমার নন্দী—আড়ানীর সবার প্রিয় ‘গোল্টু স্যার’। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি হয়তো শ্রেণিকক্ষ থেকে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও ভালোবাসার স্মৃতি আজও বেঁচে আছে তাঁর গড়ে তোলা অসংখ্য মানুষের মাঝে।
একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি যদি হয় শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, তাহলে গোল্টু স্যার নিঃসন্দেহে সেই ভালোবাসায় আজও সমৃদ্ধ।