

জাহিদুল হক বাবু, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন সোহেল রানা। স্বপ্ন ছিল, দুই সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করবেন, পরিবার নিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার গড়বেন। সেই স্বপ্ন পূরণে জমি বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত বিদেশের মাটিতেই প্রাণ হারিয়েছেন সোহেল। বর্তমানে তাঁর মরদেহ রয়েছে লাটভিয়ার দাউগাভপিলস হাসপাতালের মর্গে। স্বামীর মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে স্ত্রী জেসমিন সুলতানা ও দুই সন্তান ১৫ বছর বয়সী তাফিম আহমেদ এবং সাত বছর বয়সী জায়ানের। শোকে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার।
নিহত সোহেল রানা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হাজি আবুল হাশেমের বড় ছেলে।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় দালাল সোহাগ সরকার ও তাঁর ভাই নাসির সরকারের প্রলোভনে পড়ে সোহেলকে বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি বিক্রি করে কয়েক দফায় বিপুল পরিমাণ টাকা দেন স্বজনেরা। ইতালিতে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
সোহেলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানার অভিযোগ, প্রথমে টুরিস্ট ভিসায় সোহেলকে কাতারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তিন মাসের মধ্যে বৈধভাবে বিমানে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেন সোহাগ ও নাসির। এ জন্য প্রথম দফায় কাতারে অবস্থানকালে তাঁদের ২৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু কাতারে এক বছর অবস্থান করেও ইতালি যেতে পারেননি সোহেল।
একপর্যায়ে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর পাসপোর্ট আটকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন জেসমিন। পরিবারের পক্ষ থেকে দুই দফায় বিমানের টিকিট কেটে দেওয়া হলেও সোহেল দেশে ফিরতে পারেননি।
পরিবারের দাবি, দেশে ফেরার চেষ্টা করায় সোহেলকে অপহরণ করে মিসরে নিয়ে যায় ওই চক্র। পরে তাঁকে বেলারুশে নেওয়া হয়। সেখানে জিম্মি করে কয়েক দফায় আরও টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে চক্রটি ৪৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের অভিযোগ, পরে সোহেলকে পায়ে হেঁটে জঙ্গলের পথ দিয়ে পোল্যান্ড হয়ে লাটভিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে লাটভিয়ার জঙ্গলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে সেখানে ফেলে রেখে চলে যায় চক্রের সদস্যরা। গত ৭ অক্টোবর লাটভিয়ার সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাঁকে উদ্ধার করে দাউগাভপিলস হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা ১২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
সোহেলের বাবা হাজি আবুল হাশেম বলেন, “জমিজমা বিক্রি করে সোহাগের কথামতো কয়েক দফায় ৪৬ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। আমার সন্তানকে বিদেশে পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল তারা। অথচ ছেলেকে হারালাম, টাকাও হারালাম। এখন আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। আমি ছেলের মরদেহ দেশে ফেরত চাই এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি চাই।”
এদিকে অভিযুক্ত সোহাগ সরকারের বক্তব্য জানতে তাঁর বাড়িতে গেলে কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের দাবি, সোহেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা, জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং তাঁর মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
সোহেলের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার যে অভিযোগ তুলেছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও লাটভিয়ার হাসপাতালের নথিপত্র থেকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :