আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: আত্মপরিচয় রক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথচলা


dailymukti24 প্রকাশের সময় : ২০২৬-০৮-০৮, ৪:৪৭ PM /
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: আত্মপরিচয় রক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথচলা

নিকোলাস বিশ্বাস

প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, তাদের নানামুখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও পরিবেশ সংরক্ষণে অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো”। এর মাধ্যমে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আদিবাসী ধাত্রীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা স্বাস্থ্যচর্চার গুরুত্বকে সামনে আনা হয়েছে।

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্তমান পরিস্থিতি

বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দেশ বাংলাদেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন।

২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার। তবে বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করা হয়। এসব জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা ধরে রেখেছে।

তবে ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সংবিধানে সমতার অঙ্গীকার, বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয়ের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে এখনও বিতর্ক রয়েছে। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পেলেও ‘Indigenous Peoples’ হিসেবে পৃথক সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি এখনও আলোচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (Convention No. 107) অনুসমর্থন করে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা

আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। Kapaeeng Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে বলে সংগঠনটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক কলঙ্ক, প্রতিশোধের আশঙ্কা, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তার সীমিত সুযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকটের কারণে অনেক ঘটনাই যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয় না।

এ অবস্থায় ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনি সহায়তা এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

বিচারপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা

সহিংসতার ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তদন্তে বিলম্ব, প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ওপর চাপ এবং অপরাধীদের জবাবদিহির ঘাটতি বিচারপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ জানাতেও নিরুৎসাহিত হন। এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: বাস্তবায়নের প্রশ্ন

১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পরও এর বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান, স্থানীয় পর্যায়ে অধিকতর অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন।

সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে চুক্তির বেশ কিছু ধারা বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের একটি অংশ মনে করে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর ও গঠনমূলক সংলাপ প্রয়োজন বলে মনে করেন অধিকারকর্মীরা।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের প্রয়োজন

সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পর্যায়ের বৈঠকও এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রতিনিধিরা তাদের বিভিন্ন দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরেছেন বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো জাতীয় নীতিনির্ধারণী আলোচনায় আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে পদক্ষেপগুলো জরুরি

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—

ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা: নারী ও কন্যাশিশুসহ সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য দ্রুত তদন্ত, আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি: আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় এর যথাযথ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ জোরদার: আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে গঠনমূলক সংলাপ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।

বৈচিত্র্যের মধ্যেই বাংলাদেশের শক্তি

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের সমাজ ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরা অংশ নিয়েছেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য অবদান রেখেছেন।

তাই তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভূমি ও নাগরিক অধিকার রক্ষা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি সমতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশের সব জাতিগোষ্ঠীর মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা নয়, বরং দেশের শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬ তাই শুধু একটি দিবস পালনের উপলক্ষ নয়; বরং আত্মপরিচয়, অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস
উন্নয়নকর্মী ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক।