৮০ বছরেও খাট তৈরি করে সংসার চালান ঘোড়াঘাটের মকবুল


dailymukti24 প্রকাশের সময় : ২০২৬-১১-০২, ৩:৪৩ PM / ০
৮০ বছরেও খাট তৈরি করে সংসার চালান ঘোড়াঘাটের মকবুল

ফাহিম হোসেন রিজু, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। চলাফেরায় এসেছে ধীরগতি। তবুও থেমে নেই জীবনসংগ্রাম। জীবিকার তাগিদে ৮০ বছর বয়সেও বাঁশ ও দড়ি দিয়ে খাট তৈরি করে হাটে হাটে বিক্রি করছেন মকবুল হোসেন। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার শ্রীচন্দ্রপুর গ্রামের এই প্রবীণ কারিগরের কাছে পরিশ্রমই বেঁচে থাকার অবলম্বন।

ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় তাঁর কর্মব্যস্ততা। হাতে বাঁশ, হাতুড়ি, বাটাল ও দড়ি নিয়ে বসে পড়েন খাট তৈরির কাজে। বয়সের কারণে শরীর ক্লান্ত হলেও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁকে থেমে থাকতে দেয় না।

প্রায় এক দশক ধরে দড়ির খাট তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মকবুল হোসেন। বাঁশ ও দড়ির মতো সাধারণ উপকরণ দিয়েই তৈরি করেন বিভিন্ন আকারের খাট। পরে সেগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়ান স্থানীয় হাটবাজারে। রাস্তার পাশে খাট সাজিয়ে বসে থাকেন ক্রেতার অপেক্ষায়।

মকবুল হোসেন জানান, একটি খাট তৈরি করতে তাঁর তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। বাঁশ, দড়ি ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে খরচ হয় প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। আর তৈরি খাট বিক্রি করেন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি খাটে উপকরণ খরচ বাদে তাঁর আয় থাকে প্রায় ২০০ থেকে ৭০০ টাকা। তবে এই আয় থেকেই শ্রম ও অন্যান্য খরচের হিসাব মেটাতে হয়।

তিনি বলেন, কোনো দিন খাট ভালো বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন আশানুরূপ ক্রেতা পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিদিনের আয়ও এক রকম থাকে না। রোদ-বৃষ্টি কিংবা শারীরিক ক্লান্তি উপেক্ষা করেই জীবিকার প্রয়োজনে তাঁকে হাটে যেতে হয়।

মকবুল হোসেনের পরিবারে রয়েছে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। একসময় সামান্য জমিতে চাষাবাদের পাশাপাশি কায়িক পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করেছেন। তাঁদের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে নিজের সংসার পরিচালনা করছেন তিনি।

জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবার সুযোগ পাননি। বয়স বাড়লেও জীবিকার তাগিদে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর কাছে প্রতিটি খাট শুধু একটি পণ্য নয়, বরং সংসার চালানোর আশ্রয় এবং আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন।

গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে মকবুল হোসেনের মতো ক্ষুদ্র কারিগর ও ব্যবসায়ীদের অবদান অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। সীমিত পুঁজি, সামান্য মুনাফা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাঁরা একদিকে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটান, অন্যদিকে নিজেদের পরিবারও চালিয়ে নেন।

৮০ বছর বয়সেও মকবুল হোসেনের এই কর্মজীবন যেন গ্রামবাংলার অসংখ্য পরিশ্রমী মানুষের প্রতিচ্ছবি। বড় কোনো চাওয়া নেই তাঁর। নিজের শ্রমে উপার্জন করে স্ত্রীকে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য।

হাটবাজারের ধুলোবালি মাখা পথ আর বাঁশ-দড়ির তৈরি খাটের মধ্যেই কেটে যাচ্ছে তাঁর দিন। মকবুল হোসেনের জীবন তাই কেবল একজন ক্ষুদ্র কারিগরের জীবিকার গল্প নয়; এটি দায়িত্ববোধ, আত্মমর্যাদা ও হার না মানা জীবনসংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ।